পশ্চিমবঙ্গ সরকার রাজ্যের বিভিন্ন দফতরে কর্মরত চুক্তিভিত্তিক কর্মীদের নিয়ে বড় পদক্ষেপ নিতে চলেছে। তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে নিযুক্ত এই কর্মীদের প্রকৃত প্রয়োজনীয়তা এবং বেতন বাবদ সরকারি অর্থ সঠিকভাবে খরচ হচ্ছে কিনা তা যাচাই করতে একটি বিশেষ ‘ম্যানপাওয়ার অডিট’ শুরু করেছে নবান্ন।
দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ ছিল যে বিভিন্ন বেসরকারি এজেন্সির মাধ্যমে কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে সরকারি তহবিলের সঠিক ব্যবহার হচ্ছে না। কোথাও কোথাও প্রয়োজনের তুলনায় বেশি কর্মী নিযুক্ত রয়েছেন বলেও জানা গেছে। এই পরিস্থিতিতে নবান্ন সিদ্ধান্ত নিয়েছে, কোন দফতরে কত কর্মী আছেন, তাঁরা ঠিক কী কাজ করছেন এবং তাঁদের পেছনে মাসে মাসে কোষাগার থেকে ঠিক কত টাকা বেরিয়ে যাচ্ছে, তার একটি নির্ভুল হিসাব তৈরি করা হবে।
একসময় ওয়েবেল বিভিন্ন বেসরকারি ভেন্ডরের কাছ থেকে কর্মী সংগ্রহ করে সরকারি দফতরে পাঠাত। কিন্তু ২০২৩ সালের পর থেকে সেই ব্যবস্থায় বদল আনা হয়েছে। বর্তমানে কর্মিবর্গ বিভাগের অধীনে থাকা ‘ওয়েবেল টেকনোলজি লিমিটেড’ সরকারি দফতরে কর্মী সরবরাহের দায়িত্ব পালন করছে। এই রদবদলের পরেও নিয়োগ ব্যবস্থায় কোনো গলদ থাকতে পারে কিনা, সেটিই এখন খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এই অডিটে সবচেয়ে বেশি নজরে পড়েছে রাজ্য সরকারের ‘বাংলা সহায়তা কেন্দ্র’ বা সংক্ষেপে বিএসকে। পশ্চিমবঙ্গের সব ২৩টি জেলা মিলিয়ে প্রায় চার হাজার বিএসকে রয়েছে। সাধারণ মানুষকে বিনামূল্যে সরকারি প্রকল্পের সুবিধা পৌঁছে দেওয়াই ছিল এই কেন্দ্রগুলোর মূল উদ্দেশ্য। প্রতিটি কেন্দ্রে তিনজন করে চুক্তিভিত্তিক কর্মী রয়েছেন, যার মানে সব মিলিয়ে প্রায় বারো হাজার কর্মী কাজ করছেন শুধু এই বিএসকে কেন্দ্রগুলোতেই।
সমস্যা হলো, সরকারি মহলেই প্রশ্ন উঠছে এত বিএসকে আদৌ দরকার ছিল কিনা। এক শীর্ষ আধিকারিক নাম না জানানোর শর্তে জানিয়েছেন যে এর আগে থেকেই ‘কমন সার্ভিস সেন্টার’-এর মতো ব্যবস্থা চালু ছিল। সেই অবস্থায় নতুন করে আরও একটি সমান্তরাল ব্যবস্থা তৈরির প্রয়োজন ছিল কিনা, সেটা নিয়েই প্রশ্ন তুলছেন প্রশাসনের একাংশ।
পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে এই কারণে যে, বর্তমানে অনেক বিএসকে কেন্দ্রেই কাজের চাপ প্রায় নেই বললেই চলে। কর্মী আছেন, বেতনও যাচ্ছে, কিন্তু কাজ নেই। এই পরিস্থিতিতে রাজ্যের কোষাগার থেকে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ অর্থ খরচ হচ্ছে। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, অডিটের পরে কি বেশ কিছু পদ বাতিল করা হবে এবং কর্মী ছাঁটাইয়ের পথে হাঁটবে সরকার?
অডিটের ফলাফল কী হবে তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে চুক্তিভিত্তিক কর্মীদের মধ্যে উদ্বেগ ইতিমধ্যেই ছড়িয়ে পড়েছে। রাজ্য সরকারের এই পদক্ষেপ সরকারি ব্যয়ে শৃঙ্খলা আনবে নাকি হাজার হাজার পরিবারের রুজিরোজগারে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করবে, সেই উত্তর মিলবে আগামী কিছুদিনের মধ্যেই।

